সিএসআই ডেস্ক:
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যে গভীর সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক মাস লাগতে পারে।
সংঘাত চলাকালে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয়। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। যার বড় অংশ যায় এশিয়া ও ইউরোপে। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিকভাবে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যায়।
শুধু জাহাজ চলাচল বন্ধ করেই নয়, ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালায়। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হয়। তেল-গ্যাসের পাশাপাশি হিলিয়ামের মতো উপপণ্যের দামও বেড়ে যায়, যা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে শুরু করে নির্মাণ খাত পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এমনকি এসব উপকরণের ওপর নির্ভরশীল সার উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে, যা কৃষি মৌসুমকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে এসব দেশের ভোক্তারা সরাসরি চাপের মুখে পড়েছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে- যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কতো দ্রুত স্বাভাবিক হবে? এ বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুলের অধ্যাপক রকফোর্ড ওয়েইৎজ। বলেন, কেউ যদি বলে তারা জানে কখন বাজার স্বাভাবিক হবে, তাহলে সেটা সঠিক নয়। এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। তিনি এই সংকটকে বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধরনের বিঘ্নগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। সংঘাতের আগে প্রতিদিন প্রায় ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতো। কিন্তু যুদ্ধের পর তা নেমে আসে এক অঙ্কে। কখনো পাঁচ, কখনো সাতটি জাহাজ। এতে বোঝা যায়, সরবরাহ ব্যবস্থায় কতোটা গভীর ধাক্কা লেগেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার স্থিতিশীল করতে হলে প্রণালি দিয়ে আবার নিয়মিত ও নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। তবে এটি সহজ কাজ নয়। এর জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়- চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ভারত ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। এতগুলো পক্ষের স্বার্থ জড়িত থাকায় সমাধান জটিল হয়ে উঠেছে।
পাশাপাশি নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইরানের সম্ভাব্য টোল আরোপ নিয়ে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের কাছ থেকে ইরান প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি আদায় করতে পারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই টোল ফি তেলের দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে না। বরং মূল সমস্যা হলো নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ চেইন পুনরুদ্ধার করা।
যুদ্ধবিরতির পর প্রণালি পুনরায় চালু হলেও তা চাপ মুক্ত নয় বলে মন্তব্য করেছেন উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উষা হ্যালি। তার মতে, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন এতটাই গভীর যে, তা দ্রুত ঠিক করা সম্ভব নয়।
সমস্যা আরও বেড়েছে ইরাকসহ কিছু দেশের উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় ইরাক সাময়িকভাবে তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়, ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ আরও কমে যায়। এই উৎপাদন আবার পুরোপুরি চালু করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাজারেও একই ধরনের প্রভাব পড়েছে। অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই খাত স্বাভাবিক হতে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাও যদি পরিস্থিতি আর অবনতি না ঘটে।
এই সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, বর্তমান ৩.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে আনা হতে পারে।
সুত্র- মানবজমিন।