সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ সবসময় প্রকাশ্য সন্ত্রাসী হয় না। অনেক সময় সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে সেই মানুষগুলো, যারা ভদ্রতার মুখোশ পরে ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। সরকার বদলায়, মন্ত্রী বদলায়, ডিসি বদলায়, এসপি বদলায়, ওসি বদলায়, কিন্তু বদলায় না এক শ্রেণির চাটুকার ও দালালচক্র। এরা সবসময় টিকে থাকে। কারণ এদের কোনো আদর্শ নেই, কোনো নীতি নেই, কোনো বিবেক নেই। এদের একমাত্র লক্ষ্য হলো ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং নিজের স্বার্থ উদ্ধার করা।
প্রায় প্রতিটি শহর, উপজেলা বা জেলায় এমন কিছু মুখ দেখা যায়, যারা সব সময় প্রশাসনের টেবিল ঘিরে বসে থাকে।
নতুন কোনো ডিসি এলেই তারা ফুল নিয়ে হাজির, নতুন এসপি এলেই তারা পরিচিতির চেষ্টা শুরু করে, নতুন ওসি এলেই “স্যার স্যার” করতে করতে নিজেদের ঘনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যেন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তাদের কাঁধেই। অথচ বাস্তবে এদের অনেকেরই সমাজে কোনো প্রকৃত অবদান নেই। না আছে শিক্ষায়, না আছে মানবিকতায়, না আছে জনকল্যাণে। কিন্তু তোষামোদী আর কৌশলী সম্পর্কের মাধ্যমে এরা নিজেদেরকে “সুধীজন”, “বিশিষ্ট ব্যক্তি”, “সমাজসেবক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এরা কখনো একা কাজ করে না। এদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র থাকে। এই চক্রের বাইরে যারা থাকে সৎ মানুষ, মেধাবী তরুণ, প্রতিবাদী ব্যক্তি কিংবা স্বাধীনচেতা নাগরিক—তাদের বিরুদ্ধে এরা নানা অপপ্রচার চালায়। কারণ তারা জানে, যোগ্য মানুষ সামনে এলে নিজেদের ভণ্ডামি টিকবে না। তাই এরা সবসময় চেষ্টা করে সমাজে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে ক্ষমতার দরজা শুধু তাদের মাধ্যমেই খুলবে। যেন শহরের প্রতিটি সুযোগ, প্রতিটি পরিচয়, প্রতিটি সুপারিশের চাবি তাদের হাতেই থাকে।
এরা কখনো চায় না কোনো মেধাবী ব্যক্তি মাথা তুলে দাঁড়াক। কোনো তরুণ নিজের যোগ্যতায় সফল হোক, সেটাও তারা সহ্য করতে পারে না। কারণ মেধা ও সততা প্রতিষ্ঠিত হলে চাটুকারদের বাজার কমে যায়। তাই এরা নীরবে নানা ষড়যন্ত্র করে, সুযোগ আটকে দেয়, অপবাদ ছড়ায়, প্রশাসনের কানে বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছায়। অনেক সময় দেখা যায়, প্রকৃত যোগ্য মানুষটি অবহেলিত থেকে যায়, আর তোষামোদকারী ব্যক্তি নানা কমিটি, সুযোগ-সুবিধা, টেন্ডার, প্রভাব সবকিছু বাগিয়ে নেয়।
রাজনীতি পরিবর্তনের সঙ্গেও এদের রঙ বদলায়। আজ যে দল ক্ষমতায়, কাল তার বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে এরা মুহূর্তেই নতুন রূপ ধারণ করে। গতকাল যাকে গালি দিয়েছে, আজ তাকেই “জননেতা”, “দেশের ত্রাণকর্তা”, “অভিভাবক” বলতে শুরু করে। এদের কাছে আদর্শ মানে ক্ষমতা, আর নীতি মানে ব্যক্তিস্বার্থ। ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছাকাছি থাকতে পারলেই এরা নিজেদের নিরাপদ মনে করে। যেন রাষ্ট্র নয়, ব্যক্তিপূজাই তাদের রাজনীতি।
এই চাটুকার গোষ্ঠী শুধু সামাজিক ক্ষতিই করে না, প্রশাসনিক দুর্নীতিরও বড় পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে। কারণ এরা ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য ব্যবহার করে নানা অবৈধ সুবিধা নেয়। টেন্ডার বাণিজ্য, দখল, কমিশন, নিয়োগ বাণিজ্য, প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা আদায় সবকিছুতেই এদের নীরব সিন্ডিকেট কাজ করে। বাইরে থেকে তারা হয়তো পাঞ্জাবি পরে, মিষ্টি হাসি দেয়, বড় বড় কথা বলে, সামাজিক অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসে; কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারা সমাজের নৈতিক কাঠামো ধ্বংস করে দেয়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ অনেক সময় এই মুখোশধারীদের চিনতে পারে না। কারণ এরা খুব হিসাব করে নিজেদের উপস্থাপন করে। মসজিদে দান করে, অনুষ্ঠানে ব্যানারে নাম দেয়, অসুস্থ মানুষের পাশে ছবি তুলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভদ্রতার অভিনয় করে। অথচ বাস্তবে এরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সত্যিকারের সৎ মানুষ ক্রমে একা হয়ে যায়।
একটি সমাজ তখনই অসুস্থ হয়ে পড়ে, যখন সেখানে যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ মূল্য পায়, সততার চেয়ে সম্পর্ক বড় হয়ে যায়, আর মেধার চেয়ে দালালি বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। তখন তরুণরা হতাশ হয়, প্রকৃত মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ে, এবং সমাজ ধীরে ধীরে এক ধরনের নৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে যায়।
আজ প্রয়োজন এই মুখোশধারী চাটুকারদের চেনা। প্রয়োজন তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা। কারণ প্রকাশ্য দুর্নীতিবাজের চেয়ে ভয়ংকর হলো সেই ভদ্রবেশী সুবিধাবাদী, যে সমাজের ভেতরে থেকে সমাজকেই ধ্বংস করে। সরকার পরিবর্তন হলে রাষ্ট্র বদলায় না, যদি এই দালাল সংস্কৃতি বদলানো না যায়। প্রশাসনের টেবিলে বসে থাকা তোষামোদকারীরা যতদিন সমাজের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ততদিন প্রকৃত মেধা, সততা ও ন্যায়বিচার বারবার অবহেলিত হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই চাটুকারের দল সবসময় নিজেদেরকে সবচেয়ে সচেতন, সবচেয়ে সৎ, সবচেয়ে দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। বিভিন্ন সভা-সেমিনার, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা প্রশাসনিক বৈঠকে তারা বড় বড় কথা বলে। অপরাধ, দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস এসবের বিরুদ্ধে এমনভাবে বক্তৃতা দেয় যেন তারাই সমাজের একমাত্র নৈতিক অভিভাবক। তাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, তারা যেন ফেরেশতার মতো নিষ্পাপ মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই ভদ্রবেশী চাটুকারদের অনেকেই গোপনে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। কেউ সরাসরি জড়িত না থাকলেও পরোক্ষভাবে সুবিধাভোগী। কারো অবৈধ ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে, কেউ অপরাধীচক্র থেকে নিয়মিত অর্থ নেয়, কেউ আবার লোকবল ও প্রভাব ব্যবহার করে দূর থেকে পুরো অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সামনে থেকে কখনো নিজেদের প্রকাশ করে না, কারণ তারা জানে মুখোশ পরে থাকাই তাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
এই কারণেই তারা সবসময় এমপি, ডিসি, এসপি, ওসি কিংবা প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে মরিয়া থাকে। প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাদের কাছে শুধু সম্মানের বিষয় নয়, বরং এটি তাদের অপরাধ ও স্বার্থ রক্ষার ঢাল। তারা প্রশাসনের কাছাকাছি থেকে নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যাতে সাধারণ মানুষ ভয় পায়, আর তাদের বিরুদ্ধে কেউ সহজে কথা বলতে না পারে।
দুঃখজনক বিষয় হলো, এরা নিজেদের খুব চালাক মনে করে। তারা ভাবে, তাদের অভিনয় কেউ বুঝতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষ অনেক কিছুই বুঝে। মানুষ হয়তো সবসময় মুখ খুলে না, কিন্তু কে কোন টেবিলে বসে, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক, কে কেন হঠাৎ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে, কার আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলছে না—এসব সাধারণ মানুষ খুব সহজেই লক্ষ্য করে। সমাজ নীরবে সবকিছু দেখে, মনে রাখে, বিচারও করে।
এই চাটুকার গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো, তারা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বিভ্রান্ত করে। তারা এমপি, ডিসি, এসপি কিংবা ওসিদের কাছে নিজেদেরকে “বিশ্বস্ত ব্যক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করে। এরপর নানা মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে কর্মকর্তাদের ভুল বোঝায়। কোনো সৎ মানুষকে খারাপ হিসেবে উপস্থাপন করে, আবার কোনো অসাধু ব্যক্তিকে ভালো বলে চালিয়ে দেয়। ফলে প্রশাসনের অনেক সিদ্ধান্ত প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং এসব দালালচক্রের সাজানো কথার ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়।
আর এখানেই শুরু হয় বড় ক্ষতি। কারণ এসব ভদ্রবেশী চাটুকার প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন পক্ষ থেকে গোপনে টাকা হাতিয়ে নেয়। কেউ চাকরির আশ্বাস দেয়, কেউ টেন্ডারের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে, কেউ মামলা বা প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের অর্থ নেয়। অথচ অনেক সময় এমপি, ডিসি বা এসপি সাহেব নিজেরাও জানেন না যে, তাদের নাম ভাঙিয়ে কারা কোথায় কী করছে।
এভাবে ধীরে ধীরে একটি ভয়ংকর দালাল সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। যেখানে প্রকৃত যোগ্যতা, সততা ও ন্যায়বিচারের চেয়ে বেশি মূল্য পায় তোষামোদ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক। সমাজে তখন সৎ মানুষ নিরুৎসাহিত হয়, তরুণরা হতাশ হয়, এবং দুর্নীতিবাজরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ তারা বুঝে যায় ভালো কাজের চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাই বেশি লাভজনক।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে এখন সময় এসেছে এসব চাটুকার ও দালালদের চিহ্নিত করার। প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও বুঝতে হবে, সবসময় আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোই প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী নয়। বরং অনেক সময় নির্লোভ, নীরব, সৎ মানুষগুলোই সমাজের প্রকৃত প্রতিনিধি। তাই কোনো তথ্য, অভিযোগ বা পরামর্শ পাওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই করা জরুরি। শুধু তোষামোদ শুনে সিদ্ধান্ত নিলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর অসাধুরা লাভবান হয়।
একটি সুন্দর সমাজ গড়তে হলে সরকার, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাজের মধ্যে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাস্তবতা ও জনগণের কল্যাণকে সামনে রেখে। কোনো দালালচক্র বা সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারলেই সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাবে।
আজ সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মুখোশধারীদের চেনা। কারণ প্রকাশ্য অপরাধীর চেয়ে ভয়ংকর সেই মানুষ, যে ভদ্রতার আড়ালে সমাজকে ধ্বংস করে। যে সামনে দাঁড়িয়ে নীতিকথা বলে, অথচ পেছনে বসে দুর্নীতির ভাগ নেয়। যতদিন এই চাটুকার সংস্কৃতি বন্ধ না হবে, ততদিন প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে থাকবে।
সততা, জবাবদিহিতা ও যাচাই-বাছাইয়ের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারলেই সমাজ ধীরে ধীরে এই ভদ্রবেশী দালালদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারবে।
[লেখক- মো. আমিনুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী।]