ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের মাঠে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে হল ছাত্র সংসদ ও ছাত্রশিবিরের এক নেতার হাতে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে নারী শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনাটি তদন্তে একজন সহকারী প্রক্টরকে দায়িত্ব দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুহতাসিন বিল্লাহ ইমন দাবি করেন, শুক্রবার দিবাগত রাতে ফ্রান্স-নরওয়ে ম্যাচ দেখতে ছয়জন সাবেক শিক্ষার্থী শহীদুল্লাহ হলে যান। হলের রেজিস্ট্রারে নাম লিখে প্রবেশ করার পর মাঠে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে তাদের পরিচয় জানতে চান।
ইমনের অভিযোগ, পরিচয় দেওয়ার পর তাদের সঙ্গে থাকা এক নারীকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একপর্যায়ে আরও কয়েকজন এসে তাদের ঘিরে ধরেন এবং চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেন। পরে নিজেকে হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি এবং ক্রীড়া সম্পাদক পরিচয় দেওয়া আরেকজন তাদের চলে যেতে বলেন। তাদের আশঙ্কা দেখানো হয় যে, ছবি তুলে হলের বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে।
ইমন আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে সমাজসেবা সম্পাদক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি বলেন, ‘এখানে মেয়ে নিয়ে থাকা যাবে না।’ তখন তাদের সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি জানান, ওই নারী তার স্ত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক শিক্ষার্থী। এরপরও তাদের হল এলাকা ত্যাগ করতে বলা হয়।
অভিযুক্ত সাজু মিয়া শহীদুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথাও স্বীকার করেছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদেরকে ভদ্রভাবে চলে যেতে বলেছি। মেয়ে নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।’
এ বিষয়ে হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তৌকির হাসান বলেন, ‘এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে হল সংসদ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
এ বিষয়ে শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে রোববার সকালে আর্জেন্টিনার খেলা একসঙ্গে দেখার কর্মসূচি ঘোষণা করেন সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে নারী হেনস্তা, মোরাল পুলিশিং ও নারীবিদ্বেষী আচরণের প্রতিবাদে প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দেন হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) সানজানা চৌধুরী রাত্রী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর একজন সহকারী প্রক্টরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে একই ঘটনায় প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দেয় শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রদল। সংগঠনটির অভিযোগ, বিশ্বকাপ খেলা দেখতে আসা সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন শিক্ষার্থীকে হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়ার নেতৃত্বে হেনস্তা করে হল এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয় স্মারকলিপিতে।
অন্যদিকে পৃথক বিবৃতিতে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এ ঘটনাকে ক্যাম্পাসে মোরাল পুলিশিং, মব সংস্কৃতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে। সংগঠনটির সভাপতি সামি আব্দুল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম রিয়াদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন জায়গা নয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ক্যাম্পাসে মোরাল পুলিশিং ও হয়রানিমূলক আচরণ রোধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।