কিছু মানুষের কাছে বিশ্বকাপ ফুটবল মানে পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখা। নিজের জীবনের সঙ্গে কিছু মুহূর্তকে চিরস্থায়ী করে রাখার নাম। তপন চৌধুরীর গল্প তেমনই।
ব্যবসায়িক পরিচয়ে তিনি দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে রয়েছেন। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও দীর্ঘ পথচলা। গোপীবাগের ব্রাদার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসবের বাইরে আরেকটি দিক আছে, যা তাকে আলাদা করে। তপন চৌধুরী বিশ্বকাপ ফুটবলের এক নিবেদিত পথিক।
তার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু ১৯৮৬ সালে, মেক্সিকো থেকে। সেই সময় মেক্সিকো নিয়ে নানা আতঙ্ক ছিল। পরিচিতরা বলেছিলেন, সাবধানে থাকতে, পরিস্থিতি নাকি খুব ভালো নয়। চারদিকে ছিনতাই, নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা। ভয় তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বন্ধু ফকির মাহবুব আনামকে (বর্তমানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ) উড়ে গেলেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ দেখতে।
সেই সময়ের হিসাবেই একেকজনের খরচ হয়েছিল প্রায় ১৮শ মার্কিন ডলার। থাকা, খাওয়া, খেলা দেখা সব মিলিয়ে। তারা দেখেছিলেন সাতটি ম্যাচ। কিন্তু খেলার ফলের চেয়ে বেশি মনে গেঁথে আছে স্টেডিয়ামের বাইরের পৃথিবী।
তপন চৌধুরী এখনও মনে করতে পারেন সেই দিনটির কথা, যেদিন দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল।
তিনি বলছিলেন, সেদিন পুরো মেক্সিকো যেন উৎসবে ভেঙে পড়েছিল। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। আনন্দ, উচ্ছ্বাস, উদ্যাপন। তিনি আর তার বন্ধুও সেই জনসমুদ্রে মিশে গিয়েছিলেন।
তারপর হোটেলে ফিরে টেলিভিশনে দেখলেন আরেক গল্প, ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত হাতের গোল। মাঠে বসে তারা কেউই বুঝতে পারেননি কী ঘটেছে।
তারপর শুরু হয় এক দীর্ঘ বিশ্বকাপ যাত্রা। ১৯৯০–এ দেখেছেন রোমের সেই রাত। যেখানে ফুটবলের রাজা ম্যারাডোনা কাঁদলেন, আর জার্মানি ট্রফি তুলল।
১৯৯৪–এ দেখেছেন আমেরিকার গরমে বদলে যাওয়া ফুটবলের ভাষা। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টিতে ইতালির স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য।
১৯৯৮–এ প্যারিসে দেখেছেন তরুণ এক ফরাসি দলের উত্থান। যখন পুরো স্টেডিয়াম জিদানের নামে কাঁপছিল।
২০০২–এ এশিয়ার আকাশের নিচে দেখেছেন ব্রাজিলের পুনর্জন্ম। রোনালদো যেন হারানো সময় ফিরে পেয়েছিলেন।
২০০৬–এ দেখেছেন বার্লিনের ফাইনাল। এক মহাতারকার বিদায় ফুটবলকে বিষণ্ন করেছিল।
২০১০–এ দক্ষিণ আফ্রিকার রাতজাগা ভুভুজেলা আর স্পেনের ধৈর্যের ফুটবল তাকে নতুন এক সৌন্দর্য চিনিয়েছিল।
২০১৪–তে রিওর উৎসব আর তার মাঝেই দেখেছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ভাঙনের একটি। ব্রাজিল–জার্মানির সেই ম্যাচ। তিনি বলছিলেন, প্রথম গোল খাওয়ার পরই তার মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঠিক নেই। ব্রাজিল যেন নিজের ছায়াকেও চিনতে পারছিল না। বিরক্ত হয়ে পাশে বসা মানুষদের বলে ফেলেছিলেন, “আজ ব্রাজিল সাত গোল খাবে।” মিনিটের পর মিনিট যেন সময় থেমে গিয়েছিল। স্কোরবোর্ড বদলাচ্ছিল, মানুষ বদলাচ্ছিল। একসময় আর গোল গোনা হচ্ছিল না, গোনা হচ্ছিল স্তব্ধতা। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের চোখে পানি, মুখে অবিশ্বাস। কেউ পতাকা দিয়ে মুখ ঢেকেছে, কেউ মাথা নিচু করে বসে আছে।
তিনি বলছিলেন, জীবনে এত খেলা দেখেও কোনো দেশের ফুটবল হৃদয়কে এভাবে ভেঙে যেতে দেখেননি। যখন সপ্তম গোল হলো, পাশে বসা এক ইতালিয়ান ভদ্রলোক বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। হয়তো ভাবছিলেন, এ মানুষটা কি সত্যিই আগেই জানত।
তপন চৌধুরী হাসতে হাসতে বলেন, “আমি জ্যোতিষী ছিলাম না। শুধু মনে হয়েছিল ব্রাজিল সেদিন আর মাঠে ছিল না।”
২০১৮–তে দেখেছেন নতুন প্রজন্মের উত্থান।
আর ২০২২–এ কাতারের সেই রাত, যেখানে ফুটবল যেন এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় লিখেছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে লিওনেল মেসি ট্রফি তুললেন, আর গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু একটা ম্যাচ দেখেনি। দেখেছিল সময়কে পূর্ণ হতে।
বিশ্বকাপের সঙ্গে তার সম্পর্ক এরপরও থামেনি। এবারও তিনি বিশ্বকাপে যাচ্ছেন। এটা হবে তার দশম বিশ্বকাপ। একসময় প্রায় প্রতি আসরেই তার সঙ্গে ছেলে কিংবা মেয়ে অথবা পরিবারের কেউ না কেউ থাকত। বিশ্বকাপ ছিল পরিবারেরও উৎসব।
এবার যাত্রার আগে একটি অনুপস্থিতি তাকে অন্যরকমভাবে স্পর্শ করছে। তার ছেলে ড্যানি আর নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন তাকে। কথা বলতে বলতে থেমে যান তপন চৌধুরী। বলেন, ছেলেটাকে খুব মিস করেন।
হয়তো এবারও যাওয়ার কথা ছিল। বাবা–ছেলে একসঙ্গে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতেন। গোল হলে উঠে দাঁড়াতেন, ছবি তুলতেন, তর্ক করতেন, ফিরে এসে রাতভর আলোচনা করতেন। এখন সেই আসন খালি।
বিশ্বকাপ থেমে থাকে না। জীবনও না। তপন চৌধুরী আবার যাচ্ছেন আরেকটি বিশ্বকাপ দেখতে। এবার তার ব্যাগে থাকবে শুধু টিকিট আর পাসপোর্ট নয়, থাকবে ১৯৮৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অসংখ্য ফাইনালের আলো, হাজারো গ্যালারির শব্দ, আর এক না–ফেরা সঙ্গীর জন্য গভীর, নীরব এক অপেক্ষা।