শরীরে বিঁধে আছে এক যুগ আগের সেই কালো রাতের তপ্ত সিসা। মেরুদণ্ডে এখনো অনুভূত হয় প্রশাসনের বুটের নিষ্ঠুর আঘাত। এক যুগ বা ১২টি বছর পার হয়ে গেলেও যন্ত্রণার সেই ক্ষত শুকায়নি; বরং শরীরের ভেতর রয়ে যাওয়া গুলির অবশিষ্টাংশ প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১৩ সালের ৫ মে’র সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি। তিনি মাওলানা মনসুর আহমদ আসজাদ।
শাপলা চত্বরের সেই ঐতিহাসিক গণজমায়েতের এক জীবন্ত সাক্ষী, যিনি আজও লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে, বয়ে চলছেন বুলেটের অসহ্য যন্ত্রণা।
মাওলানা মনসুর আসজাদ তখন টগবগে যুবক। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিকন্দরপুর মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফির ডাকে সাড়া দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন ঢাকার শাপলা চত্বরে। দিনভর জিকির, দোয়া আর তিলাওয়াতে মুখর শান্ত চত্বরটি মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাতের গভীরে।
মাওলানা আসজাদ সেই রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
তিনি জানান, রাত তখন প্রায় দুইটা। হঠাৎ চারদিকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুরু হয় মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ। প্রাণ বাঁচাতে তিনি মাটিতে বসে পড়লে পেছন থেকে প্রশাসনের সদস্যরা তার মেরুদণ্ডে সজোরে লাথি মারে। একই সময়ে তার পায়ে এসে বিঁধে গুলি। রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। সেই থেকে শুরু এক অন্তহীন কষ্টের মহাকাব্য।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কোনোমতে যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। পরে সেখান থেকে সিলেটে ফিরে শুরু হয় চিকিৎসার দীর্ঘ পথচলা। শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিঁধে থাকা গুলিগুলো বের করতে এ পর্যন্ত তিনবার বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।
শুরুতে স্থানীয় ক্লিনিক এবং পরবর্তীতে সিলেটের আরোগ্য মেডিকেলে প্রখ্যাত সার্জন ডা. রাশেদুন্নবী খানের অধীনে তার অস্ত্রোপচার হয়। বের করা হয় বেশ কিছু গুলির অংশ। এরপর মেরুদণ্ডের জটিল আঘাতের জন্য আবারও ছুরি-কাঁচির নিচে যেতে হয় তাকে।
দীর্ঘ কয়েক বছর স্থিতিশীল থাকার পর আবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তীব্র ব্যথায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে গত ১ মে সিলেটের একটি ট্রমা সেন্টারে তার তৃতীয় দফা অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এক যুগ পার হলেও এখনো তার শরীরে গুলির অংশ রয়ে গেছে, যা তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
মাওলানা মনসুর আহমদ আসজাদ সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর এলাকার ছিলিমপুর গ্রামের মরহুম মাওলানা নিজাম উদ্দিনের সন্তান।
সহপাঠী ও স্বজনদের অভিযোগ, শাপলা চত্বরের ঘটনায় হাজারো মানুষের নাম তালিকায় আসলেও মাওলানা আসজাদের নাম আজও কোনো সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পাননি কোনো রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক বিশেষ সহায়তা।
সিলেটের ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন এই আলেমের বর্তমান অবস্থা সংকটাপন্ন। তার সহকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের জন্য, ঈমানের জন্য যারা অকাতরে রক্ত দিয়েছেন, ১২ বছর পরও তাদের কেন এভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকতে হবে?
তারা মাওলানা আসজাদকে দ্রুত সরকারিভাবে আহতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার এবং তার উন্নত চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
এক যুগ আগের সেই ক্ষত যেন মাওলানা আসজাদের জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে না হয় এটাই এখন তার পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের একমাত্র প্রত্যাশা।