সুনামগঞ্জ রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইংরেজি | ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বাংলা | ৯ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
Ad
আজকের CSI News - সি এস আই নিউজ সংবাদ
সি এস আই নিউজ
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬ ইং
অনলাইন সংস্করণ

যে হত্যাকাণ্ডে কেঁদেছিল দেশবাসী, শুধু কান্নার অধিকার ছিল না স্ত্রী-কন্যার

ছবি: সংগৃহীত

টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হককে ক্রসফায়ারে হত্যার সেই অডিও কাঁদিয়েছিল গোটা দেশকে। কিন্তু স্বজন হারানোর পর মন খুলে কাঁদার অধিকারটুকুও মেলেনি পরিবারের। উলটো ভিটেমাটি ছেড়ে চট্টগ্রামে গিয়ে বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে নজরদারির ছায়ায়। দীর্ঘ আট বছর পর অবশেষে খুলেছে বিচারের দুয়ার।

সে সময় ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে?’ মেয়ের এই অবুঝ প্রশ্নে থমকে গিয়েছিল পুরো দেশ। মোবাইল ফোনের ওপারে বাবার শেষ আর্তনাদ শুনেছিল কোটি মানুষ। 

মোবাইল ফোনে বাবাকে ওই প্রশ্নটি করেছিল একরামুল হকের বড় মেয়ে তাহিয়া হক। তখন তাহিয়া টেকনাফ ৮ বিজিবি (বর্ডার গার্ড) স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। তার ছোট বোন নাহিয়ান হক পড়ত ষষ্ঠ শ্রেণিতে। ২০১৮ সালের ২৬ মে গভীর রাতে বাবার ফেরার অপেক্ষায় অধীর হয়ে ফোন দিয়েছিল কিশোরী তাহিয়া। ওপাশ থেকে বাবার চেনা কণ্ঠ ভেসে এলেও তাতে স্নেহের স্পর্শ ছিল না। ছিল মৃত্যুর আতঙ্ক। 

মূলত তৎকালীন র‌্যাব-৭-এর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন একরাম। মেয়ের সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আর হয়নি বাবার। মা আয়েশা বেগম শিউরে উঠে মেয়ের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে দরূদ পড়তে শুরু করেছিলেন। কিন্তু অলৌকিক কিছু ঘটার আগেই স্পিকার চিরে ভেসে এলো আগ্নেয়াস্ত্রের হাড়হিম করা শব্দ-‘ঠাস! ঠাস! পরপর দুটি গুলির বিকট গর্জন। এরপর জীবনের আলো নিভে যাওয়ার করুণ গোঙানি। ফোনের এ-প্রান্তে তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন এক নারী-যার ভালোবাসার সংসার নিমিষেই শ্মশান হয়ে গেল।

নামের মিলে বদির সিন্ডিকেট রক্ষায় বলি একরাম : টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পরপর তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং তৎকালীন স্থানীয় যুবলীগ নেতা একরামুল হককে হত্যার আগেই সাজানো হয়েছিল এক কুৎসিত রূপকথা। অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন সংসদ-সদস্য আবদুর রহমান বদির নিকটাত্মীয় ও তার মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন টেকনাফের নাজিরপাড়ার মৃত ফজল আহামেদের ছেলে একরামুল হক। প্রশাসনিক চাপ ও মাদকবিরোধী অভিযানের হাত থেকে তাকে আড়াল করতে সাধারণ টিনের ঘরে বাস করা একরামের গায়ে এঁটে দেওয়া হয়েছিল ‘ইয়াবার গডফাদার’ তকমা। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট-গণমাধ্যমের চোখে তাকে আগেভাগেই অপরাধী বানিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা, যাতে মূল অপরাধীরা বেঁচে যায়।

ভিটেমাটি উচ্ছেদের পরও নজরদারি : হত্যাকাণ্ডের পর সেই ফোনালাপের অডিও ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় শুরু হয়। তথ্য যেন বাইরে না যায়, সেজন্য একরামের পরিবারকে তড়িঘড়ি করে ভিটেমাটি থেকে এক প্রকার উচ্ছেদ করা হয়। বাধ্য হয়ে টেকনাফ ছেড়ে চট্টগ্রামে গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেন আয়েশা বেগম ও তার দুই মেয়ে তাহিয়া ও নাহিয়ান। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে চট্টগ্রামে তাদের বর্তমান ঠিকানা ও অবস্থান সম্পর্কিত কোনো তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন একরামের স্ত্রী।

সেখানেও মুক্তি মেলেনি ভয়ংকর নজরদারি থেকে। আয়েশা জানান, তাদের ঘরের বাইরে ২৪ ঘণ্টা ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত বিশেষ বাহিনীর লোক। সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল মহড়া দিত অচেনা মুখ। ঘরে ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে হুমকি দেওয়া হতো-‘মেয়েদের নিয়ে বের হবেন না, বেশি নাড়াচাড়া করলে আপনাদেরও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’ আইনের দরজাতেও তারা বারবার ধাক্কা খেয়েছেন। টেকনাফ থানায় পুলিশ মামলা নেয়নি। আদালতের আশ্রয় নিতে আইনজীবীদের কাছে গেলেও পরদিনই তাদের চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত সিভিল ড্রেসের লোক। ভয়ার্ত চোখে কেসের ফাইল ফিরিয়ে দিয়ে আইনজীবীরা বলতেন, আমাকে ক্ষমা করবেন, এই মামলা লড়ার সাহস আমাদের নেই।

কাঁন্নাও নিষেধ ছিল : সেদিন মন খুলে কাঁদার অধিকারটুকুও পাননি একরামের স্ত্রী ও এতিম দুই মেয়ে। একরামের স্ত্রী আয়েশা অভিযোগ করেন, তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ফোন করে সংবাদমাধ্যম বা মানবাধিকার সংস্থার সামনে মুখ না খুলতে, কান্নাকাটি না করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরিবারটিকে শান্ত রাখতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিয়ে যাওয়া এবং সঠিক বিচারের আশ্বাস দেওয়া হলেও সময় গড়ালে দেখা যায় তা ছিল কেবল মুখ বন্ধ রাখার কৌশল।

আয়েশা বেগম আরও বলেন, আমার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে মিডিয়ার সামনে অপরাধী বানিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দেশ কেঁদেছিল, কিন্তু মন্ত্রীরা ফোন করে আমাকে চুপ থাকতে বলেছিলেন।

আট বছর পর বিচারের আশা : রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে বিচারের দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। আট বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৌঁছেছে সেই রাতের অডিও রেকর্ড, উচ্ছেদের দলিল ও আয়েশা বেগমের দীর্ঘদিনের জমানো চোখের জল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের ও সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে এবং জারি করা হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা।

দীর্ঘদিনের পাথরচাপা কষ্ট নিয়ে আয়েশা বেগম বলেন, আমার স্বামী কোনো ইয়াবা কারবারি ছিলেন না, চক্রান্ত করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। যারা আমার জীবন ছাই করে দিয়েছে, আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যেতে চাই।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাতীয় কবির সম্মানে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা, জারি হলো গেজেট

1

আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, নিহত ৩

2

যেভাবে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান হয় ভারতীয় গরু মহিষ

3

ফরিদপুর কারাগারে এক হাজতির মৃত্যু

4

কত বছর বয়সে রাজনীতি ছাড়বেন জানালেন ফজলুর রহমান

5

এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তরের ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব ঢাকা বিশ্বব

6

প্রশান্ত মহাসাগরে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল চীন, উদ্বেগে

7

রাশিয়া-চীন ইরানকে সাহায্য করলে পরিণতি ‘খুব খারাপ’ হবে: ট্রাম

8

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি সারজিস আলম

9

টেস্ট সিরিজ খেলতে ঢাকায় পৌঁছেছে পাকিস্তান দল

10

গাজার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে ভালো লাগছে: ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী

11

এখন পর্যন্ত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পেয়েছে কতটি পরিবার, জানালেন প্র

12

পুশইন ঠেকাতে রাত জেগে পাহারায় গ্রামবাসী

13

আজকে সবার মুখোশ ফাঁস করব: মৌসুমী হামিদ

14

রামিসা হত্যার বিচার ৭ দিনের মধ্যে শেষ হতে পারে: স্বরাষ্ট্রমন

15

দীর্ঘ ছুটি শেষে প্রাণ ফিরেছে ময়মনসিংহের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো

16

তৃণমূলের ৪৪০ কোটি রুপির তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ

17

পারাবত এক্সপ্রেস থেকে ১৮ কেজি গাঁজা উদ্ধার, গ্রেপ্তার ১

18

ঈদের আনন্দে বগুড়ার পার্কগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড়

19

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের আসামি হচ্ছেন ইনু

20