বিশ্বকাপ ফুটবল এবং ফিফার বাণিজ্যিক রাইটস বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দিতে এক বিশাল ও বিতর্কিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার আয় ও ইভেন্ট পরিচালনার জন্য একটি ২০ বিলিয়ন (২ হাজার কোটি) ডলারের নতুন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
এই প্রকল্পে সায় দিয়ে এককালীন ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) ডলারের অফার গ্রহণ করতে ফিফার ২১১টি সদস্য ফেডারেশনকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মূলত ২১১টি সদস্যসংস্থাকে দেওয়া উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণ বৃদ্ধির বড় উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ইনফান্তিনোর এই হঠাৎ ও তড়িঘড়ি নেওয়া পদক্ষেপে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যান্য প্রধান ফুটবল সংস্থাগুলো। বিশেষ করে ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা উয়েফা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নিজেদের ৫৫টি সদস্য দেশকে নিয়ে অনলাইনে বৈঠক ডেকেছে।
কী আছে ইনফান্তিনোর প্রস্তাবে?
মডেল অনুযায়ী ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে ২০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের একটি নতুন ফিফা সাবসিডিয়ারি তৈরি করা হবে। এই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার বা মালিকানা ছেড়ে দেওয়া হবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে। আর বদলে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করবে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক কাজ ও স্বত্ব।
ইনফান্তিনো তার চিঠিতে এটিকে ফিফা সদস্য ফেডারেশনগুলোর জন্য এক ‘অনন্য ও যুগান্তকারী অর্থায়নের সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যেসব সদস্য ফেডারেশন এই প্রকল্পে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেবে, তারা ২০৩০ বিশ্বকাপ চক্রের মধ্যে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ পাবে। চুক্তি প্রত্যাখ্যান করলে আগের মতো ১০ মিলিয়ন ডলারের মতো অনুদান বজায় থাকবে।
জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারের প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’ এই প্রকল্পের মূল বিনিয়োগকারী হিসেবে থাকছে। পুরো বিনিয়োগ প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবে বিশ্বখ্যাত ব্যাংক জেপি মরগান।
বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও বয়কটের হুমকি
প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই ফুটবল মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। উয়েফা কঠোর ভাষায় বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘বিশ্বকাপ ফিফার একার সম্পত্তি নয় যে তারা তা বিক্রি করে দেবে। ফিফা ফুটবলকে নিজেদের ও বন্ধুদের পকেটে টাকা ভরার উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না।’
পরিস্থিতি মোকাবেলায় উয়েফা আবার ফিফা প্রতিযোগিতা বয়কটের পথ বেছে নিতে পারে—ঠিক যেমনটি ২০২১ সালে ইনফান্তিনোর দুই বছর পর পর বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে তারা করেছিল।
কেবল ইউরোপ নয়, এশিয়া (এএফসি) এবং উত্তর আমেরিকান ফুটবল সংস্থা (কনকাকাফ)-ও এই গোপন ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। এমন সিদ্ধান্তে কনকাকাফ জানিয়েছে, ‘যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাবে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
এএফসি-ও নিজেদের হতাশার কথা প্রকাশ করে জানিয়েছে, ‘এত বড় একটি সিদ্ধান্ত আমাদের সঙ্গে আলোচনার আগেই সংবাদমাধ্যমে চলে আসায় আমরা চরম হতাশ।’ অন্যদিকে, কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই সংবাদপত্রের মাধ্যমে এই খবর জানতে পেরেছে বলে ৮৫০টি প্রভাবশালী ইউরোপীয় ক্লাবের প্রতিনিধিরা জানিয়েছে।
ব্রিটিশ রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেন, ‘ফুটবল কোনো বিনিয়োগকারীর সম্পত্তি নয়। এর মালিক শুধুই সমর্থকেরা। একবার বিক্রি শুরু করলে ফুটবলের আত্মাই বিক্রি হয়ে যাবে।’
একচ্ছত্র ক্ষমতা ও ট্রাম্প সংযোগ
ইনফান্তিনোর ১১ বছরের ফিফা প্রেসিডেন্ট মেয়াদে এটিই প্রথম নয়। এর আগেও ২০১৮ সালে তিনি ফিফাকে আড়ালে রেখে ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি রহস্যময় ফান্ড গঠনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে বারবার মেলামেশা ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রবণতাও আবার নতুন করে আলোড়ন তুলেছে—যার মধ্যে নতুন ট্রাম্পকে ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান এবং জশুয়া কুশনারের বিনিয়োগ সংস্থাকে ১২ বছরের মালিকানা চুক্তিতে যুক্ত করার মতো বিষয়গুলো জড়িত।
আগামী ১৮ নভেম্বর ফিফা প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন এবং মার্চে মরক্কোর রাবাতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় যা প্রায় ইনফান্তিনোর নিশ্চিত জয়ের দিকেই যাচ্ছিল, নতুন এই বিতর্কিত পদক্ষেপের পর সেখানে রাজনৈতিক মোড় ঘোরে কিনা—এখন সেটাই দেখার বিষয়।